১)বিসিএস পরীক্ষার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে ক্যাডার পছন্দক্রম-এ কথা মোটামুটি পরীক্ষার্থীমাত্রই স্বীকার করবেন।আমরা সবাই সরকারি চাকুরিতে আসার পেছনে দেশসেবা,সামাজিক প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি অবশ্যম্ভাবী কারণগুলোর পাশাপাশি আরও অনেক বিষয় চিন্তা করি।কেউ কেউ পছন্দ করি দেশ-বিদেশে ভ্রমন এবং আন্তর্জাতিক মানের জীবনযাত্রা,তাঁদের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র ক্যাডার হয়ে দাঁড়ায় প্রথম পছন্দ।কেউ বা দেশের নীতিনির্ধারণে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার কথা চিন্তা করি-প্রশাসন ক্যাডার সেক্ষেত্রে পছন্দক্রমের শুরুতেই চলে আসে।কারো কারো ক্ষেত্রে আবার ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু চ্যালেঞ্জিং জীবনযাত্রার হাতছানি অগ্রাহ্য করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়-সেক্ষেত্রে পুলিশ ক্যাডার তুলে দিই পছন্দক্রমের শীর্ষে।
২)আমরা প্রতিটি মানুষ একেকটি ভিন্ন ভিন্ন সত্তা,আমাদের পছন্দ-অপছন্দগুলোও তাই প্রায় প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র।বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের যে ২৮টি ক্যাডার রয়েছে তাদের প্রত্যেকটিরই নিজস্ব কিছু সুযোগ-সুবিধা রয়েছে যেগুলোর একটির সাথে অন্যটির তুলনা করা যাবেনা।যেমনঃ পররাষ্ট্র ক্যাডারে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের জীবনযাত্রার সুযোগ যেটি পুলিশ বা এ্যাডমিন ক্যাডারে সেরকমভাবে পাওয়া যাবেনা।আবার একজন পুলিশ বা এ্যাডমিন ক্যাডার দেশের একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কাজ করার যে সুযোগ পেয়ে থাকেন তা পররাষ্ট্র ক্যাডারে অনুপস্থিত।এছাড়া কাস্টমস,অডিট,ইকোনমিক,ট্যাক্সসহ অন্যান্য ক্যাডারগুলোতেও একই রকম স্বতন্ত্র সুযোগ সুবিধা রয়েছে।
৩)একটি স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে আপনি যখন ক্যাডার পছন্দক্রমের কথা চিন্তা করবেন তখন আপনার চিন্তা করা উচিত আপনার জন্যে কোন ক্যাডারটি সবচাইতে বেশি উপযুক্ত।যে ক্যাডারে যোগ দিলে আপনার প্রতিভা সবচাইতে বেশি বিকশিত হবে এবং সবচেয়ে দক্ষভাবে আপনি দেশসেবা করতে পারবেন বলে মনে করেন,আপনার প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত সেটিই।“আমি সেই ক্যাডারেই যোগ দেব যেটি বাকি সব ক্যাডারের উপর কর্তৃত্ব করে” অথবা “অমুক ক্যাডার সবচাইতে ক্ষমতাবান”- এধরণের চিন্তাধারা শুধুমাত্র কলোনিয়াল এবং অগণতান্ত্রিকই নয়,কোন কোন ক্ষেত্রে তা আপনাকে সবার সামনে হাসির খোরাকও বানিয়ে দিতে পারে।
৪)বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল একটি দেশে একজন পাবলিক সারভেন্ট নিজেকে পাবলিক “সারভেন্ট” হিসেবে ভাববেন এবং সেই অনুসারে কাজ করবেন-এই আশাতেই কিন্তু দেশের গরীব মানুষের টাকা থেকে তাকে নানারকম সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়।নিজেকে পাবলিক “সারভেন্ট” না ভেবে “মাস্টার” বা প্রভু ভাবা শুরু করলে একদিকে তা যেমন পাবলিক সার্ভিসের মূল লক্ষ্যের বিচ্যুতি ঘটায়,আরেকদিকে তা পতনকেও ত্বরান্বিত করে।বিসিএস পরীক্ষার প্রথম ধাপ অর্থাৎ ফর্ম পূরণের সময় থেকেই এ বিষয়টি আপনার চিন্তাচেতনার সর্বগভীর স্তরে প্রোথিত হওয়া প্রয়োজন।
৫)আমরা বিসিএস পরীক্ষার্থীরা অনেক সময় ভালোভাবে না জেনেই মানুষের মুখের কথা শুনে নানারকম ক্যাডার নিজের প্রথম,দ্বিতীয়,তৃতীয় পছন্দ হিসেবে দিয়ে ফেলি।পরবর্তীতে দেখা যায় নিজের পছন্দমত ক্যাডারে যোগদান করার পর মোহভংগ ঘটে,নানারকম হতাশায় নিমজ্জিত হতে হয়।অথচ ফর্ম পূরণের সময় আরেকটু বিচার বিবেচনা করে ক্যাডার পছন্দক্রম প্রদান করলে এটি এড়ানো যেত;আপনি আপনার জন্যে মানানসই ক্যাডার পেতেন আবার আপনার জায়গায় ওই ক্যাডারে হয়তো এমন কেউ আসতেন যার জন্যে সেটি যথোপযুক্ত হত।
৬)আমাদের এ গ্রুপে নানান ক্যাডারে কর্মরত অনেক সম্মানিত সদস্য রয়েছেন।আমরা যদি নিজ নিজ ক্যাডারের ভালোমন্দ সম্পর্কে এখানকার বিসিএস পরীক্ষার্থীদেরকে প্রাথমিক একটা ধারণাও দিতে পারি, সেটিও মনে হয় সঠিক ক্যাডার নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।অন্ততঃ একজন পরীক্ষার্থীও যদি এই লেখাগুলো পড়ে সঠিক সার্ভিসে যোগদান করেন-সেটিই বা কম কি?সে নিজে যেমন উৎফুল্লভাবে জীবনের অন্ততঃ ২৫-৩০ বৎসর কাজ করতে পারবে,দেশও পাবে একজন স্বতঃস্ফূর্ত সেবক।আর এ উদ্দেশ্য থেকেই এ লেখার সুত্রপাত,এটিকে দয়া করে কেউ পুলিশ ক্যাডারের বিজ্ঞাপন বলে ভেবে নেবেন না

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *